|
তিন
দশকের বেশি সময় ধরিয়া পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠার অন্য নাম ছিল বামফ্রন্ট সরকার। আপাতত তাহার বিসর্জনের ঘণ্টা প্রবল নিনাদে বাজিতেছে, যিনি বাজাইতেছেন তাঁহার নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পুরসভার পরে, অনুমান করিবার বিলক্ষণ হেতু
আছে যে, অদূর ভবিষ্যতে তিনি মহাকরণেও ক্ষমতায় আসিতে পারেন। ক্ষমতা পরিতৃপ্তি আনে, তাহা তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রীর কথায় ও আচরণে সুস্পষ্ট। ক্ষমতা দায়িত্বও আনে। সেই দায়িত্ববোধের প্রমাণও কিন্তু নেত্রীর নিকট প্রত্যাশিত। ক্ষমতার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব— ক্ষুদ্রকে অতিক্রম করিয়া বৃহতের সাধনা। নির্দিষ্ট করিয়া বলিলে, দলধর্ম ছাড়িয়া রাজধর্মের সাধনা। যাঁহার হাতে
রাজ্যপাট, তিনি একটি বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর নেতা হইতে পারেন, কিন্তু শাসক হিসাবে তিনি সর্বজনের প্রতি দায়বদ্ধ। কলিকাতার মেয়র তাঁহার দলের মেয়র নহেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তাঁহার দলের মুখ্যমন্ত্রী নহেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁহার দলের প্রধানমন্ত্রী নহেন। ইহা কেবল নীতি নহে, আদর্শ নহে, ইহাকে
প্রতিনিয়ত আপন আচরণের মধ্য দিয়া প্রমাণ করিতে হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি তাহার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করিয়াছেন?
বুদ্ধদেব
ভট্টাচার্য, তাঁহার পূর্বসূরির মতোই, সচরাচর
এই দায়িত্ববোধের
পরিচয় দিতে পারেন নাই, দলের স্বার্থের
নিকট রাজ্যের স্বার্থ বিসর্জন দিয়াছেন।
বুদ্ধদেববাবু হয়তো
কিছু কিছু ক্ষেত্রে দলধর্ম ছাড়িয়া
রাজধর্মে উত্তীর্ণ হইবার যৎকিঞ্চিৎ
চেষ্টা করিয়াছিলেন,
কিন্তু দলের চাপে তিনি অচিরে পথভ্রষ্ট
হইয়াছেন
অথবা মধ্যপথে বসিয়া পড়িয়াছেন।
সি পি আই এম-এর নেতাদের এই দলসবর্স্বতার
মাসুল দিয়াছে পশ্চিমবঙ্গ।
দলতন্ত্রের তাড়নায়
এই রাজ্য শিল্পচ্যুত হইয়াছে।
দলতন্ত্রের তাড়নায়
এই রাজ্যের শিক্ষার মান অতলে নামিয়াছে।
এমনকী বিমানবন্দরের উন্নতিসাধনেও
বাধা দিয়াছে দলের ক্ষুদ্রস্বার্থ—
দিল্লি বা মুম্বইয়ের
বিমানবন্দর যখন আন্তর্জাতিক
মানের পথে অগ্রবর্তী, কলিকাতাকে তখন কার্যত একটি তৃতীয়
শ্রেণির বিমানবন্দর লইয়াই
সন্তুষ্ট
থাকিতে হইয়াছে। ইহা দায়িত্বজ্ঞানহীনতারই
মাসুল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কি এই পন্থাই অনুসরণ করিবেন? তিনিও কি আপন নীতিতে, আচরণে
এবং কর্মপন্থায়
দলকে রাজ্যের উপরে স্থান দিবেন? না কি,
তিনি যথার্থ দায়িত্ববোধের
পরিচয় দিবেন?
পুরভোটের
ফল ঘোষণার পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
উদার, সর্বজনমুখী প্রশাসন-রীতির প্রতিশ্রুতি
দিয়াছেন। তাঁহার আচরণে সর্বদা
তেমন ভরসা মেলে না। গত কয়েক
দিনে দুইটি উপলক্ষে তাঁহার প্রতিক্রিয়া
এক ধরনের মানসিকতার সংকেত দিয়াছে,
যাহা দায়িত্বজ্ঞানের
পরিচায়ক নয়।
জ্ঞানেশ্বরী
এক্সপ্রেসের
বিপর্যয়ের পরে তিনি যে ভাবে চক্রান্ত
ইত্যাদির অভিযোগ করিয়াছেন, তাহা দুর্ভাগ্যজনক।
পুরভোটের সময়
পুলিশের গুলিতে আহত এবং
পরে মৃত বাপি ধর সম্পর্কে তিনি যে সব মন্তব্য
করিয়াছেন তাহা আরও দুর্ভাগ্যজনক।
উভয়
ক্ষেত্রেই তাঁহার পক্ষে দুঃখপ্রকাশে
নিজেকে সীমিত রাখাই হইত দায়িত্বজ্ঞানের
পরিচায়ক। সেই সংযম
তিনি প্রদর্শন করিতে পারেন নাই। এবং
এই অসংযমের পিছনে কাজ করিয়াছে
ক্ষুদ্র দলীয়
স্বার্থ। সি পি আই এমের প্রতি
বিরাগ বা বিদ্বেষ তাঁহার দৃষ্টি
এতটাই আচ্ছন্ন করিয়াছে
যে তিনি স্বাভাবিক শোভনতাটুকুও
বজায় রাখিতে ব্যর্থ হইয়াছেন।
বিভিন্ন স্তরের
ক্ষমতা তাঁহার দলের হাতে আসিতেছে, দায়িত্বও।
ভোটের পরীক্ষায় তিনি জয়ী
হইতেছেন, কিন্তু রাজধর্মের পরীক্ষা অনেক
বেশি কঠিন। বুদ্ধদেববাবুরা ভোটের পরীক্ষায় দীর্ঘদিন সফল হইয়াও
রাজধর্মের পরীক্ষায় ব্যর্থ হইয়াছেন।
সেই ধারা আর নয়। পরিবর্তন চাই। প্রকৃত
পরিবর্তন।
|