|
সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয়তম শব্দবন্ধ ‘পরিবর্তন
চাই’। রাজনৈতিক পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন রাজ্যকে অরাজকতা হইতে, অমর্ত্য সেনের
ভাষায়, ‘রাজকতা’য় লইয়া যাইতে পারিবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও
ভবিষ্যতের গর্ভে। কিন্তু, সুশাসনের প্রথম শর্ত একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ প্রশাসনের তৎপর উপস্থিতি। পশ্চিমবঙ্গে যে বর্তমানে তাহার কণামাত্র
নাই, বর্ষশেষের একটি ছবি তাহা স্পষ্ট করিয়া দিল। হাবরার নিহত কংগ্রেস নেতা বাপি চৌধুরীর পরিবার তাঁহার মৃত্যুর এগারো দিন পর মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করিলেন। এবং, তাহার পরেই, তাঁহাদের বাড়ির সম্মুখে পুলিশ পিকেট বসিল, জেলার পুলিশকর্তারা
আসিয়া দেখা করিয়া গেলেন, নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেন। অনুমান করা চলে, পুলিশের এই আকস্মিক তৎপরতার পশ্চাতে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ রহিয়াছে। অথবা, সেই নির্দেশ আসিবার পূর্বেই কর্তারা বুঝিয়াছেন, এই পরিবারের রাজনৈতিক খুঁটি ধরিবার ক্ষমতা আছে। অতএব, তাঁহারা আর কালক্ষয় করেন নাই। হাবরার ঘটনাটি ব্যতিক্রমী নহে, পশ্চিমবঙ্গে ইহাই নিয়ম। বাপি চৌধুরীর পরিবারের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যদি সত্যই জরুরি হইয়া থাকে, তাহা হইলে এই এগারো দিন সেই ব্যবস্থা করা হয় নাই কেন, এবং, যদি নিরাপত্তার আদৌ প্রয়োজন না থাকে, তবে মুখ্যমন্ত্রীর প্রবেশমাত্র তাহা হইল কেন— এই প্রশ্নগুলির উত্তর পুলিশ প্রশাসনের নিকট বিলক্ষণ আছে। রাজ্যের প্রশাসন রাজনীতির নিকট নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করিয়াছে বলিয়াই আজ এই অবস্থা। এই পঙ্গু, নিষ্ক্রিয় প্রশাসনের পরিবর্তন ব্যতীত কোনও রাজনৈতিক পরিবর্তনই পশ্চিমবঙ্গকে রাজকতায় লইয়া যাইতে পারিবে না। নূতন বৎসরে
যদি একটি পরিবর্তনও সম্ভব হয়, তবে এই প্রশাসনিক অপদার্থতা
বিদায় হউক।
প্রশাসনিক অপদার্থতার বর্তমান উপাখ্যানটিতে মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় চরিত্র নহেন, তিনি প্রতিভূমাত্র। ক্ষমতার প্রতিভূ। প্রশাসন ক্ষমতার, বিশেষত
রাজনৈতিক ক্ষমতার নিকট নতজানু। সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা যে সর্বদা মুখ্যমন্ত্রীর স্তরের, তাহা নহে।
থানা লোকাল কমিটির মুখাপেক্ষী, বিডিও স্থানীয় পঞ্চায়েতপ্রধানের, মহাকরণের আধিকারিকরা সমন্বয় কমিটির নেতার। যে রাজনীতি এবং প্রশাসন গণতন্ত্রের দুই প্রধান স্তম্ভ, পশ্চিমবঙ্গে দুর্ভাগ্যক্রমে সেই দুইটি প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রের পরিসরে ছোট বড় অসংখ্য সামন্ততন্ত্রের জন্ম দিয়াছে। সেখানে
রাজনৈতিক ক্ষমতাবানরা সামন্তপ্রভূ, প্রশাসন সেই প্রভূর আজ্ঞাবাহী। এবং, আজ্ঞাবাহী হওয়ার কারণেই আত্মসম্মানহীন, মেরুদণ্ডহীন। আর,
সাধারণ মানুষ সেখানে নাগরিক নহেন, প্রজা। প্রভূর মর্জির উপর নির্ভর
করে, আজ্ঞাবাহী শাসনব্যবস্থা প্রজার কোনও উপকারে আসিবে কি না। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও, তাঁহার যাবতীয় সদিচ্ছা সমেত, এই সামন্ততন্ত্রেরই অংশী। রাজানুগ্রহে
যেমন বাপি চৌধুরীর পরিবারের নিরাপত্তার ব্যবস্থা হইয়াছে।
দুই বৎসর পূর্বেও
বলা যাইত, প্রশাসনের আনুগত্য সম্পূর্ণত সি পি আই এম-এর প্রতি। রাজ্যের সার্বিক পরিবর্তনের হাওয়ায় এখন আর সেই কথাটি বলিবার উপায় নাই। লক্ষণীয়, প্রশাসনের আনুগত্য, অন্তত কিছু ক্ষেত্রে হইলেও, বদলাইয়াছে, কিন্তু অনুগত হইবার অভ্যাসটি অপরিবর্তিত।
প্রশাসনকে এমন বশংবদ করিয়া তুলিবার কৃতিত্ব অবশ্য সম্পূর্ণ সি পি
আই এম-এর, কিন্তু সে প্রশ্ন থাক। আপাতত বুঝিয়া লওয়া প্রয়োজন, এই অনুগত
প্রশাসনই রাজ্যে রাজকতা প্রতিষ্ঠার পথে বৃহত্তম
বাধা। প্রশাসন যে রাজনৈতিক দলগুলির পৈতৃক সম্পত্তি নহে, এই আপাত-অবিশ্বাস্য সত্যটি
কর্তাদের মরমে প্রবেশ করা প্রয়োজন। তাঁহাদের
বুঝিতে হইবে, প্রশাসন একমাত্র জনগণের নিকট দায়বদ্ধ। মানুষের স্বার্থরক্ষা করাই তাহার একমাত্র উদ্দেশ্য, কোনও
ক্ষমতাকেন্দ্রের দাস্যবৃত্তি নহে। রাজনৈতিক রং বিচার প্রশাসনের কাজ নহে, তাহার কাজ আইনের প্রতিষ্ঠা। পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন এখন যে মানসিক অবস্থায় রহিয়াছে, তাহাতে
এই কথাগুলি সম্যক বুঝিয়া উঠা তাহার পক্ষে কঠিন। নূতন বৎসরে না হয় এই কঠিন কাজটিই সাধিত হউক। নূতন বৎসরের মূলমন্ত্র হউক ‘পরিবর্তন চাই’।
|