|
|
|
|
|
রবিবাসরীয় প্রবন্ধ
...
|
|
আদর
বাঁদর সন্ত্রাস
এবং
অর্থনীতি
|
|
বাঁদরের
শরীর
কেনা, জীবনবিমা নেই? তবে সন্ত্রাসবাদী
বলে চেনা।
অর্থনীতির দারুণ
যুক্তি ঘেঁটে দেখলেন
অমিতাভ
গুপ্ত
|
|
|
|
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল-নিউ হ্যাভেন হসপিটাল। সেখানে সাইকিয়াট্রিস্ট লরি স্যান্টোসের ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন দুই গবেষক। দু’জনেই
এশীয়— কিথ চেন আর বেঙ্কট লক্ষ্মীনারায়ণন। কিথ চেনের পৈতৃক ভিটে চিনে, আর বেঙ্কটের
ভারতে। তাঁদের সঙ্গে আছে আরও সাত জন— চারটি মেয়ে, এবং তিনটি ছেলে বাঁদর। তারা ক্যাপুচিন প্রজাতির— ফুরফুরে খয়েরি রঙের লোমওয়ালা বাঁদর, মোটামুটি এক বছরের বাচ্চার সমান
লম্বা। লম্বা লেজ, আর খুব ছোট মগজ। এতটাই ছোট যে ক্যাপুচিনরা খাওয়া, ঘুম আর যৌনতা বাদে আর কিছু নিয়েই ভাবতে পারে না। (মেয়েরা অবশ্য বেশির ভাগ পুরুষ সম্বন্ধেই এই কথাটা বলে এবং ভেবে থাকেন, কিন্তু যাক সে কথা)।
কিথ চেন আর বেঙ্কট লক্ষ্মীনারায়ণনের গবেষণা, বুঝতেই পারছেন, এই সাতটি বাঁদরকে নিয়ে। আরও স্পষ্ট করে বললে, তাদের ওই ছোট্ট মগজটাকে নিয়ে। মগজের ওই সাইজ নিয়ে ওরা টাকাপয়সার ব্যবহার শিখতে পারে কি না, পরীক্ষা করে
দেখছিলেন কিথ। চকচকে কিছু রুপোর চাকতি হল মুদ্রা। কিথরা প্রথমে বাঁদরদের হাতে রুপোর চাকতিগুলো ধরিয়ে দিতেন, তার পর তাদের সামনে ধরতেন ফলের ঝুড়ি। গোড়ার দিকে বাঁদরদের টাকার ব্যবহার শেখাতে বিস্তর বেগ পেতে হল। টাকা হাতে পেলে প্রথমে সেটাকে খেয়ে দেখার চেষ্টা করত বাঁদররা, তার পর ‘অখাদ্য’ বুঝে
ছুড়ে ফেলে দিত। এ রকম চলল বেশ কয়েক মাস। তার পর, এক দিন তারা বুঝে
নিল, চাকতিগুলোর দাম আছে। কিথ বা তার সহকর্মীদের হাতে
একটা চাকতি তুলে দিতে পারলেই পাওয়া যায় ফলের ঝুড়ি। প্রথমে এক জন, তার পর দু’জন, তার পর সবাই শিখে নিল টাকার ব্যবহার। রুপোর চাকতি হাতে পেলেই তার বিনিময়ে ফল নিয়ে আসত। ওই ছোট মগজেই টাকার ব্যবহার ঢুকে পড়ল।
|
|
|
|
আরও অনেক কিছু হল। দোকানে, মানে কিথদের ফলের
টেবিলের সামনে, গিয়ে তারা নিজের নিজের পছন্দের ফল বেছে নিল। সবার পছন্দ এক রকম নয় মোটেই। আলাদা পছন্দের জন্য আলদা দাম দিতে শিখল। দাম
কমা-বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফল কেনার পরিমাণ বাড়াতে-কমাতে শিখল। মানে, গড়িয়াহাটের বাজারে দাঁড়িয়ে দর করা ছাড়া টাকার যাবতীয় ব্যবহার রপ্ত হয়ে গেল তাদের। তারা জুয়ো খেলতেও শিখল।
এক দিন ক্যাপুচিনদের দলের এক দুর্ধর্ষ ছেলে
বাঁদর ফেলিক্সের মন মেজাজ খারাপ ছিল কোনও কারণে (ও হ্যাঁ,
ওদের সাত জনেরই আলাদা আলাদা নাম ছিল— জেমস বণ্ড-এর সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রের নামে)। ফেলিক্স নিজের দৈনিক বরাদ্দের বারোটা কয়েন নিল না, বরং এক টানে সেগুলোকে ছড়িয়ে ফেলল খাঁচার ভিতর। বাকি
বাঁদররা ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই টাকার জন্য। স্বাভাবিক। হুটোপুটি করে বাকি ছ’জন যে যার মতো কয়েন কুড়িয়ে নিল। কিথের মেরুদণ্ড টানটান। পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার মতো নতুন গবেষণার সুযোগ— বাড়তি টাকা পেয়ে কী করবে বাঁদরগুলো? তাঁর সহকারীরা ফলের ঝুড়ি বাড়িয়ে ধরলেন। সে দিকে এগিয়ে গেল তিনটে মেয়ে আর একটা ছেলে বাঁদর। ফেলিক্স মুখ গোমড়া করে বসে। আর, একটা ছেলে বাঁদর ফলের ঝুড়ির দিকে না গিয়ে এগিয়ে গেল একটা মেয়ে বাঁদরের দিকে। নিজের কুড়িয়ে পাওয়া কয়েনটা তুলে দিল মেয়েটার হাতে। তার পর, কী যেন বলল।
পরার্থপর বাঁদর! নিজে না খেয়ে পয়সা দিয়ে দিচ্ছে বন্ধুকে! কিথ স্তম্ভিত। কিন্তু, স্তম্ভিত হওয়ার বাকি ছিল আরও খানিকটা। কয়েনটা মেয়েটার হাতে দেওয়ার পরই আরম্ভ হল দু’জনের সঙ্গম। বাকি সব কিছু ভুলে, টানা আট সেকেণ্ড চলল উদ্দাম যৌনতা (আট সেকেণ্ডই। হাজার হোক, ওরা বাঁদর তো)। আর, সেটা ফুরোতেই, মেয়ে বাঁদরটা হাঁটা দিল ফলের ঝুড়ির দিকে। এই মাত্র পাওয়া কয়েনটা দিয়ে ফল কিনল, তার পর খেয়ে ফেলল।
|
|
|
|
কিথ যাকে ভেবেছিলেন বাঁদরের পরার্থপরতা,
সেটা আসলে একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিজ্ঞানের দীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথম বাঁদরদের
মধ্যে বেশ্যাবৃত্তির ঘটনা নথিভুক্ত হল। হায়, টাকার কী মহিমা। মাত্র বছরখানেক সময়ে বদলে দিল বাঁদরদের সামাজিক চরিত্রটাই। মানুষের আর দোষ কী!
এই বশ্রর বাধ সাধলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
গবেষণার জন্য রাখা বাঁদরদের এই ভাবে বয়ে যেতে (বা, মানুষ হয়ে উঠতে, যে ভাবে আপনি দেখবেন) দিতে তাঁরা রাজি নন। ফলে, হাজার ইচ্ছে থাকলেও
বাঁদরদের মধ্যে পুঁজিবাদের বিকাশ দেখা হল না কিথ চেনের।
এ বার কিথ চেনের পরিচয় দেওয়া যাক। তিনি প্রাণীবিজ্ঞানী নন। মন-চিকিৎসকও নন। তিনি পেশায় অর্থনীতিবিদ। অবশ্য, বাঁদরদের মধ্যে টাকার ব্যবহার শুরু করার মতো বিটকেল গবেষণার কথা সম্ভবত অর্থনীতিবিদদের মাথাতেই আসতে পারে। কিন্তু, কিথের মাথাতেই বা হঠাৎ এমন বিদঘুটে ভাবনা এল কেন? এল অ্যাডাম স্মিথের হাত ধরে। সেই অ্যাডাম স্মিথ, বলা হয়, যাঁর ‘অ্যান এনকোয়্যারি ইনটু দ্য নেচার অ্যাণ্ড কজেজ অব দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ থেকেই জন্ম অর্থনীতি নামক শাস্ত্রটির। অ্যাডাম স্মিথ লিখেছিলেন, ‘আজ অবধি কেউ কি কোনও কুকুরকে আর একটা কুকুরের কাছে গিয়ে একটা হাড়ের বিনিময়ে আর একটা হাড়, বা অন্য কিছু, নিতে দেখেছে? কোনও জানোয়ারই সম্ভবত এই কাজটা করবে না।’ অন্য ভাবে পড়লে, অ্যাডাম স্মিথের মূল বক্তব্য ছিল, মানুষ ছাড়া অন্য কোনও প্রাণীর পক্ষে টাকাপয়সা ব্যবহার সম্ভব নয়, কারণ তারা বিনিময়ের অর্থই বোঝে না। কথাগুলো পড়ে কিথের মনে একটা আপাত-অর্থহীন প্রশ্ন জেগেছিল— আমি যদি বাঁদরদের টাকাপয়সার ব্যবহার শেখাতে পারি, তা হলে কী হবে? তবে, নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, শেষ পর্যন্ত জিনিসটা যে বেশ্যাবৃত্তিতে পৌঁছে যাবে, কিথ স্বপ্নেও ভাবেননি।
|
|
|
|
কিথ
চেনের কথা যখন হল, তখন সুধীর বেঙ্কটেশের সঙ্গেও আলাপ করে নেওয়া যাক। সুধীর ইউনিভার্সিটি অব কলম্বিয়ায় সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক। সেই সঙ্গে আফ্রিকান-আমেরিকান স্টাডিরও। সুধীরের গবেষণার বিষয়গুলো একটু অন্য ধরনের। গবেষণার পদ্ধতি? মারাত্মক রকম অন্য ধরনের। তাঁর পিএইচ ডি থিসিস লেখার জন্য সুধীর
ঘাঁটি গেড়ে বসেছিলেন শিকাগোর আফ্রিকান-আমেরিকান জনবসতির একেবারে ভিতরে, একটা আধা তৈরি বাড়িতে, যেখানে একটা ড্রাগ পেডলারদের দলের স্থানীয় অফিস ছিল! তাঁর পরের গবেষণা শিকাগোর
যৌনকর্মীদের নিয়ে। একেবারে খুঁটিনাটি তথ্য, সেনসাস রিপোর্টে যে রকমটা থাকা উচিত, অথচ থাকা সম্ভব নয়— সেই সব তথ্য। যেমন, কোন ধরনের গ্রাহক
কোন ধরনের যৌনক্রিয়া পছন্দ করেন; কোনটার জন্য কে কতখানি খরচ
করতে রাজি; কারা এসে দর কষাকষি করেন, আর কারা এক দরে রাজি হয়ে যান; এক জন যৌনকর্মী দিনে কত সময় কাজ করে বছরে কত ডলার উপার্জন করেন।
প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়ার সহজ রাস্তা— সরাসরি যৌনকর্মীদের জিজ্ঞেস করে নেওয়া। সহজ, অতএব ভুল। সরাসরি জিজ্ঞেস করলে অনেকগুলো কারণে ভুল উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। এক, যৌনকর্মীদের পক্ষে ঠিকঠিক সমস্তটা মনে রাখা প্রায় অসম্ভব। দুই, সরাসরি জানতে চাইলে ইচ্ছাকৃত ভুল উত্তর দেওয়ার হার অনেক বেশি। সুতরাং, সুধীর অন্য রাস্তা ধরলেন। তিনি শিকাগোর তিনটি নিষিদ্ধ পল্লিতে লোক লাগালেন। তাঁদের কাজ— বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে, ব্রথেলের সামনে, অর্থাৎ যেখানে যেখানে যৌনকর্মীরা
খদ্দের ধরেন, সে জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা। মন দিয়ে তাঁদের কথাবার্তা শোনা, এবং টুকে রাখা। সুধীরের এই গুপ্তচরেরা সবাই প্রাক্তন যৌনকর্মী, সুতরাং তাঁদের পক্ষে এই দেনাপাওনার গল্পের খুঁটিনাটি বুঝে নেওয়া সহজ। কাজ হল। দু’বছর পরে
দেখা গেল, সুধীরের হাতে শিকাগোর মোট ১৬০ জন যৌনকর্মীর বাইশশো’রও বেশি
যৌন-বাণিজ্যের যাবতীয় পরিসংখ্যান জমা পড়েছে।
সেই পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া গেল একটা চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। ওরাল সেক্সের দাম একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে— গড়ে প্রতি ওরাল সেক্সের দাম ৩৭.২৬ ডলার। সেখানে ভ্যাজাইনাল সেক্সের দাম ৮০ ডলার, অ্যানাল সেক্সের দাম প্রায় ৯৫ ডলার। বাজারের নিয়ম মেনে চাহিদা সবচেয়ে বেশি ওরাল সেক্সেরই— মোট যৌন-ব্যবসার ৫৫ শতাংশ।
|
|

|
যৌনকর্মীদের নিয়ে গবেষণাটি একা সুধীরের নয়। তাঁর সঙ্গে এক জন অর্থনীতিবিদ
ছিলেন। বস্তুত, গবেষণার পরিকল্পনাটি তাঁরই। পরিসংখ্যান চমকে দিল তাঁকে। কারণ,
এভারলি ক্লাবের গল্প তাঁর জানা ছিল আগাগোড়া। একশো বছর আগের শিকাগো শহরের সবচেয়ে বড় ‘পাপের কেন্দ্র’ এই এভারলি ক্লাব। জমজমাট যৌনপল্লি লেভি ডিষ্ট্রিক্টের সবচেয়ে নামকরা গণিকালয়— যেখানকার প্রতিটি মেয়ে পরীর মতো সুন্দরী। তাদের গায়ের ত্বক মসলিনের মতো, চুলে ঝরনার উচ্ছ্বাস, দাঁতে মুক্তোর ঝলক। তাঁরা বিদুষী। |
|
|
ক্রেতার অভিরুচি থাকলে তাঁরা স্মৃতি থেকে শোনাতে পারতেন শেলি কিংবা কিটস-এর কবিতা। এবং, তাঁরা মহার্ঘ। আজকের হিসেবে
এভারলি ক্লাবের এক এক জন যৌনকর্মীর বার্ষিক মাইনে দাঁড়াত ৭৬,০০০ ডলার। মনে মনে এক বার আটচল্লিশ দিয়ে গুণ করে নিন। আর, এই এভারলি ক্লাবের বিশেষত্ব ছিল— তারা খদ্দেরের কোনও যৌন ইচ্ছেকেই ফেরাতো না। এখানেই পাওয়া যেত মহার্ঘ সব যৌন পরিষেবা। এমনকী, ফ্রেঞ্চ স্টাইলও। অবশ্য, তার দাম পড়ত প্রচুর। খুব রহিস এবং শৌখিন মানুষ ছাড়া কেউ কিনতে পারত না সেই যৌনতা। এই ‘ফ্রেঞ্চ
স্টাইল’-কেই এখন ওরাল সেক্স বলে।
কী এমন হল, যাতে মাত্র একশো বছরে মহার্ঘতম
থেকে সবচেয়ে কম দামি হয়ে গেল এই যৌনক্রিয়াটি? তার চরিত্রের তো কোনও বদল হয়নি এর মধ্যে। পুরুষের অপছন্দেরও হয়ে যায়নি যৌনতার এই ধরন। তবে? ভাবতে ভাবতে
উত্তর খুঁজে পেলেন সুধীরের বন্ধু সেই অর্থনীতিবিদ। ওরাল সেক্স বদলায়নি, একশো বছরে বদলে গিয়েছে সমাজের চরিত্রটাই। একশো বছর আগে
ওরাল সেক্স ছিল মারাত্মক নিষিদ্ধ এক আনন্দ। নিজের স্ত্রী, প্রেমিকা বা বান্ধবীর কাছে
মুখ ফুটে এই যৌনতার কথা ভাবতেই পারতেন না পুরুষরা। অন্তত অধিকাংশ পুরুষ। ফলে, এই সুখের জন্য যৌনকর্মীর দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না কোনও। তাও সব গণিকালয়ে নয়। সবাই এই পরিষেবা দিত না। এই নিষিদ্ধ ফল পাওয়া যেত এভারলি ক্লাবের অপ্সরাদের কাছে। ফলে, তার দাম ছিল আকাশ
ছোঁয়া।
মাঝের একশোটা বছর ওরাল সেক্সের গা থেকে ‘নিষিদ্ধ’ তকমাটি খুলে নিয়ে পুরোপুরি। এখন প্রায় সব জুটির কাছেই এই ক্রিয়াটি নিয়মিত যৌনতার অঙ্গ। বা, তারও বেশি। যেমন, মার্কিন কিশোরীদের কাছে। তারা
যৌনতা চায়, কিন্তু এখনই গর্ভবতী হয়ে পড়তে চায় না। আবার, তাদের পুরুষ বন্ধুদের বেশির ভাগেরই রাবারে অ্যালার্জি— তারা কণ্ডোম ব্যবহারে নারাজ। ফলে, সব দিক বজায় রাখতে ওরাল সেক্সই নিরাপদতম পন্থা তাদের কাছে। হায়, একশো বছর আগে যা ছিল দুষ্প্রাপ্যতম আনন্দ, এখন তা পাওয়া জলের মতো সহজ। আর, অনায়াসেই যা পাওয়া যায়, তার দাম কম হবেই। অর্থনীতির
একেবারে গোড়ার কথা এটা। না হলে, হাওয়ার দাম, জলের দাম অনেক বেশি হত হিরের তুলনায়।
|
| যৌনতার
জটিল ধাঁধাকে যিনি ব্যাখ্যা করে দিলেন অর্থনীতির প্রাথমিক সূত্রে, সুধীর বেঙ্কটেশের সেই অর্থনীতিবিদ বন্ধুর সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক এ বার। তাঁর নাম স্টিভেন লেভিট। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। জন বেটস ক্লার্ক মেডেল পেয়েছেন ২০০৩ সালে। এই পুরস্কারটিকে স্বচ্ছন্দে অনূর্ধ্ব-চল্লিশ অর্থনীতিবিদদের নোবেল বলা চলে। এখন তাঁর খ্যাতি দুনিয়া জোড়া। কিন্তু, অর্থনীতির গবেষণার জন্য নয়। ২০০৫ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ের জন্য। স্টিফেন ডাবনারের |

|
|
|
সঙ্গে লেখা বই, ‘ফ্রিকনমিকস’। দুনিয়া জুড়ে বেস্টসেলার তো বটেই, বইটি তৈরি করে দিল পপুলার ইকনমিকস-এর নতুন একটি ধারা—
২০০৫ থেকে আজ পর্যন্ত এই গোত্রের বই প্রকাশিত হয়েছে অজস্র। স্টিভেন, এবং তাঁর অনুসারী লেখকদের দাবি, অর্থনীতির একেবারে সরল কিছু নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করে দেওয়া যায় গোটা দুনিয়ার যাবতীয় জটিল কাজকর্ম, আপাত-ধাঁধাকে। সেক্স, ভায়োলেন্স, প্রেম, বিয়ে, ডিভোর্স, লেখাপড়ার মান, চুরি, পরার্থপরতা— সব কিছু। এই বইয়ের তালিকায় শেষতম সংযোজনটি ফের স্টিভেন লেভিট আর স্টিফেন ডাবনারের সুপার ফ্রিকনমিকস।
লেভিট বলছেন, সব ঘটনার পিছনে যুক্তি আছে। আছেই।
যে সব ঘটনায় যুক্তিগুলো সরাসরি সামনে এসে পড়ে, সেগুলোকে নিয়ে সমস্যা নেই। যে সব ক্ষেত্রে যুক্তি আড়ালে লুকিয়ে থাকে, আমরা সেগুলোকে অনেক সময় ‘যুক্তিহীন’ বলে চালিয়ে দিই। লেভিটের আসল আনন্দ সেই সব যুক্তি খুঁজে বের করার। তথ্যের গাদা থেকে যুক্তির ছুঁচ খুঁজে বার করার আনন্দ। লেভিট সংখ্যা ভালবাসেন— পর্বতপ্রমাণ পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখতে পান আশ্চর্য সব প্যাটার্ন, ছক— যেগুলো সচরাচর ধরা পড়ে না প্রথাগত অর্থনীতিবিদদের চোখে। আর, সেই সব ছকের কথা নিয়েই বই লেখেন তিনি। সুপারফ্রিকনমিকস-ও তাই।
আর, অন্য যাঁরা খুঁজে বার করেন এই রকমই অদ্ভুত সব যুক্তি, তাঁদের কথাও লেখেন লেভিট। কিথ চেনের বাঁদর গল্প আর সুধীর বেঙ্কটেশের যৌনকর্মীদের কথা সুপারফ্রিকনমিকস-এই আছে।
ইয়ান হর্সলে-র কথাও আছে এই বইতে। তবে, নামটি আসল নয়। এই বইয়ে ব্যবহার করা একমাত্র ছদ্মনাম। কেন? কারণ, ইয়ানের পেশা সন্ত্রাসবাদীদের চিহ্নিত করা। না, তিনি পুলিশে চাকরি করেন না, গোয়েন্দা বিভাগেরও লোক নন। ইয়ান মধ্যবয়স্ক, লণ্ডনের ভিড় থেকে দূরে থাকতে ভালবাসেন, সাধারণ চেহারা— ইয়ান নিজেই নিজের সম্বন্ধে বলেন, ‘আমি ভীষণ সাধারণ, এবং বেশির ভাগ লোক আমার সঙ্গে আলাপ হওয়ার খানিকক্ষণের মধ্যেই আমায় ভুলে যায়!’
ইয়ান পেশায় ব্যাঙ্ককর্মী। তবে, টাকাপয়সার হিসেব রাখা নয়, তাঁর কাজ গ্রাহকদের হিসেব রাখা। ব্যাঙ্কের বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের মধ্যে কে ক্রেডিট কার্ডের দেনা শোধ না-ও করতে পারে, নতুন কোন
আবেদনকারী আসলে টাকা মেরে দেওয়ার তালে আছে— ইয়ান এই সব হিসেব করেন। তাঁর কম্পিউটারে দেশের সব মানুষের যাবতীয় অর্থনৈতিক লেনদেনের নথি রয়েছে। সেই নথি ঘেঁটে ইয়ান একটা ছক খোঁজার চেষ্টা করেন— ঠগদের অর্থনৈতিক লেনদেনের
নির্দিষ্ট ছক। এই ছকের সঙ্গে কোনও নতুন গ্রাহক বা
আবেদনকারীর অর্থনৈতিক লেনদেনের চরিত্র মিলে গেলে তাঁদের সম্বন্ধে সাবধান হতে হয়।
|
|

|
ইয়াপ এ কাজে খুব সফল। আর, কাজটি করতে করতেই তাঁর মনে নতুন ভাবনা এল— যদি ব্যাঙ্কের বিপুল
তথ্যের সমুদ্র থেকে শুধু অঙ্কের মাধ্যমে ঠিকঠাক ধরে ফেলা যায় সম্ভাব্য চিটিংবাজদের, এই একই তথ্য থেকে কি সন্ত্রাসবাদীদের ধরা সম্ভব? আপাত-অসম্ভব একটা ভাবনা, এবং ঠিক সেই কারণেই ইয়ান হর্সলে বা স্টিভেন লেভিটদের কাছে তা আকর্ষণীয়।
৯/১১-র সঙ্গে যুক্ত ১৯ জন সন্ত্রাসবাদীর ব্যাঙ্কিং পরিসংখ্যান এল |
|
|
ইয়ানের কাছে। বেশ কয়েকটি বিনিদ্র রাতের পর সেই পরিসংখ্যান থেকে ফুটে উঠল নির্দিষ্ট ছক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক জন গড়পড়তা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের চেয়ে এই ১৯ জন বেশ কিছু দিক থেকে আলাদা। যেমন, তারা সবাই মোটামুটি চার হাজার
ডলার জমা করে বেশ নামকরা কোনও ব্যাঙ্কের বড় কোনও শাখায় অ্যাকাউন্ট খুলেছিল, বাড়ির ঠিকানার বদলে ব্যবহার করেছিল পোস্ট বক্স নম্বর। তাদের বেশির ভাগের কাছেই বিদেশ থেকে ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারের মাধ্যমে টাকা আসত, কিন্তু কখনওই এক সঙ্গে এত টাকা নয় যে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ মাথা ঘামাবেন তা
নিয়ে। তারা সবাই একবারে অনেকটা টাকা জমা করত, তার পর একটু একটু করে তুলত।
তাদের টাকা জমা দেওয়া বা তোলার কোনও নির্দিষ্ট সময় ছিল না।
এই ছক থেকে এক জন সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদীকে শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু, কতখানি নিখুঁত ভাবে? জটিল প্রশ্ন। ধরা যাক, ছক এতই নিখুঁত হল যে ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে ঠিক ভাবে সন্ত্রাসবাদীদের শনাক্ত করা সম্ভব। দারুণ, তাই তো? এ বার ধরুন, ব্যাঙ্কের মোট গ্রাহক সংখ্যা পঞ্চাশ লক্ষ পাঁচশো জন। তার মধ্যে পাঁচশো জন সন্ত্রাসবাদী, বাকি পঞ্চাশ লক্ষ নির্ভেজাল নাগরিক। এ বার, সব গ্রাহকের
যাবতীয় ব্যাঙ্কিং তথ্য ফেলা হল কম্পিউটারে, ইয়ানের ছকে। ৯৯ শতাংশ ঠিক, মানে এক শতাংশ ভুল উত্তর দেবে ছক। ফল কী দাঁড়াবে? সন্ত্রাসবাদীদের মধ্যে ধরা পড়বে ৪৯৫ জন, ধরা পড়বে না মাত্র ৫ জন। নিরপরাধ মানুষদের উনপঞ্চাশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার জন নিরপরাধ ঘোষিত হবেন। এবং, প-ঞ্চা-শ হা-জা-র নিরপরাধ মানুষ চিহ্নিত হবেন সন্ত্রাসবাদী হিসেবে। এক শতাংশ ভুল। কেলেঙ্কারি।
|
| কাজেই, ছকটাকে আরও নিখুঁত করতেই হল। তথ্যের পাহাড় ঘাঁটতে আরম্ভ করলেন ইয়ান। তার আগে, যুক্তি ব্যবহার করলেন। যেহেতু
ব্রিটেনের প্রধান সমস্যা এখন ইসলামি সন্ত্রাসবাদ, সুতরাং, সন্ত্রাসবাদীদের নাম ইসলামি হওয়াই স্বাভাবিক। এ যাবৎকাল পাওয়া সব পরিসংখ্যানও বলছে, কারও নাম এবং পদবির কোনওটাই যদি ইসলামি না হয়, তবে তার সন্ত্রাসবাদী হওয়ার সম্ভাবনা পাঁচ লক্ষে এক। |

|
|
|
নাম ও পদবির
মধ্যে একটা ইসলামি হলে সন্ত্রাসবাদী হওয়ার সম্ভাবনা ত্রিশ হাজারে এক। আর, দুটোই ইসলামি হলে,
কুড়ি হাজারে এক। খোঁজার কাজটা গোড়াতেই সহজ হয়ে গেল।
ওপরের অনুচ্ছেদটা পড়ে যদি মনে হয়, ইয়ানের গবেষণার লক্ষ্য সব মুসলমানকে,
বা বেশির ভাগ মুসলমানকে সন্ত্রাসবাদী প্রতিপন্ন করা, তবে মারাত্মক ভুল হবে। বরং উল্টোটা। ইয়ানের গবেষণা ভেঙে দিল অনেক প্রচলিত বিশ্বাস। তাঁর তথ্যের পাহাড় জানাল, মসজিদের কাছাকাছি থাকা, ভাল
চাকরি করা অথবা না করা, কিংবা বিবাহিত হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদী হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। পুলিশের অন্দরমহলে প্রায় বদ্ধমূল ধারণা ছিল, অবিবাহিত, বেকার
কোনও পঁচিশ বছরের যুবক মসজিদের ধারেকাছে বাস করলে সে নির্ঘাৎ সন্ত্রাসবাদী। ইয়ান হর্সলে-র সিদ্ধান্ত ইংল্যাণ্ডের এই রকম বহু মুসলমান যুবকের জীবনে যথেষ্ট শান্তির ব্যবস্থা করতে পেরেছে শেষ পর্যন্ত।
তা হলে সন্ত্রাসবাদী হওয়ার সম্ভাবনা কাদের বেশি? ইয়ানের কম্পিউটার জানাল, সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদীর কাছে মোবাইল ফোন থাকবে, সে নিজের
বাড়ির বদলে ভাড়াবাড়িতে থাকবে, সে ছাত্র হিসেবে এই দেশে
আসবে। ব্যাঙ্কে তার সেভিংস অ্যাকাউন্ট থাকবে না। সে শুক্রবার বিকেলে এ টি এম থেকে টাকা তুলবে না। তার
কোনও লাইফ ইনশিয়োর্যান্স পলিসি থাকবে না। আর একটি সূত্র, ফ্যাক্টর এক্স, খুলে বলেননি ইয়ান। কিন্তু জানিয়েছেন, এই সব ক’টা শর্ত যদি কারও ক্ষেত্রে মিলে যায়— তবে তার সন্ত্রাসবাদী হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
|
|
|
|
আশ্চর্য! সব ক’টা কারণ বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এমনকী, শুক্রবার বিকেলে এ টি এম-এ টাকা তুলতে না যাওয়াও। ওই সময়টা জুম্মাবারের নামাজ থাকে। কিন্তু, কোনও সন্ত্রাসবাদীরই জীবনবিমা পলিসি নেই কেন? তাদের এক
জনও পরিবারের কথা ভাবে না? ভেবে দেখুন— একটা পলিসি কেনা থাকলেও সেই সন্ত্রাসবাদী দিব্যি এড়িয়ে যেতে পারত পুলিশের চোখ, অন্তত বহু দিনের জন্য। তবে?
এখানেই
যুক্তির খেলা। সুপারফ্রিকনমিকস। আর কেউ না জানুক, এক জন সন্ত্রাসবাদী নিজে পরিষ্কার জানে, কোনও এক দিন তাকে যেতে হবে আত্মঘাতী জঙ্গি হিসেবে— কোনও দূতাবাসে,
কোনও হোটেলে, হাসপাতালে, অথবা শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কেন্দ্রে। জেহাদের স্বার্থে প্রাণ দিতে হবে তাকে। আর, সে এই কথাটাও একই রকম
ভাবে জানে যে দুনিয়ার কোনও ইনশিয়োর্যান্স কম্পানি আত্মঘাতী জঙ্গির মৃত্যুতে তার
পরিবারকে একটি পয়সাও ঠেকাবে না। অতএব, জীবনবিমার জন্য টাকা ব্যয় করা তার কাছে নিতান্ত বাজে খরচ। অতএব, সন্ত্রাসবাদীদের জীবনবিমা থাকে না।
শেষ
পর্যন্ত
সবটাই যুক্তি। যুক্তির দৌলতেই ওরাল সেক্সের
দাম কমে যায়। যুক্তিই আত্মঘাতী
সন্ত্রাসবাদীকে
জীবনবিমা পলিসি কিনতে দেয়
না। আবার সেই যুক্তিই ধরিয়ে
দেয়
তাকে। আশ্চর্য। অথবা, আশ্চর্য
নয়। বাঁদর যদি যুক্তির পরাকাষ্ঠা
দেখিয়ে বেশ্যাবৃত্তিতে নেমে পড়তে
পারে, মানুষ তো আর একটু বুদ্ধিমান।
ছবি:
উদয়
দেব
সূত্র:
সুপারফ্রিকনমিকস।
স্টিভেন
ডি লেভিট, স্টিফেন
জে
ডাবনার।
উইলিয়াম
ম্যারো, ২০০৯
|
|
|