|
মাস দু’য়েক ধরে বুচির
ঠিকানা ছিল দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতাল। হাসপাতালের নার্সরাই
তখন তার বাবা-মা। অথচ বুচি আজ অত্যন্ত আদরে বড় হচ্ছে একটি সম্পন্ন পরিবারে। সৌজন্যে,
জেলা শিশু কল্যাণ সমিতি অর্থাৎ, চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি। গত এক
বছরে ১১টি শিশুকে এমনই নিশ্চিত ঠিকানার ব্যবস্থা করে দেওয়ার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রেখেছে এই সংস্থা। সংস্থার চেয়ারপারসন মধুমিতা
জাজোরিয়া জানালেন, আগামী জানুয়ারিতে আরও ৫ অনাথ শিশুকে তুলে দেওয়া হবে দত্তক নিতে
ইচ্ছুক পরিবারের হাতে।
ফুটপাথ থেকে ডাস্টবিন এমনকী ঝোপঝাড়। পরিত্যক্ত নবজাতকদের পাওয়া যায় এমন সব জায়গাতেই। এর পর সরকারি
হাসপাতাল ঘুরে তাদের জায়গা হয় কোনও হোমে।
বড় হতে হতে তাদের
অনেকে অনেক সময় কুসঙ্গেও পড়ে। সবুজ শৈশব
হারিয়ে যায়। তাদের মধ্যে ক্রমেই বেড়ে ওঠে অপরাধ প্রবণতা। আর
পাঁচটা শিশু যখন বাবা মার সঙ্গে নিজের পরিবারে পরম যত্নে লালিত হচ্ছে,
তখন তারা ক্রমশই এগিয়ে যায় অনির্দিষ্ট লক্ষ্যে। অনেকে
জড়িয়ে পড়ে চুরি, খুন বা বিভিন্ন রকম নেশার সঙ্গে।
পেটের জ্বালায় তাদের কেউ কেউ পাড়ার চায়ের দোকানে বা
শহরের কোনও বাড়িতে পরিচারকের কাজও নেয়।
পরিত্যক্ত
নবজাতকদের যাতে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় সে জন্যই ২০০০
সালে পেশ করা হয় ‘জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট ২০০০’ আইনটি।
সেই আইনের বলে গড়ে ওঠে জেলা চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি। আগে মূলত
সরকারি আমলারাই সংস্থার দেখভাল করতেন। কিন্তু পরবর্তী কালে প্রশাসনের উপলব্ধি হয়, যে সাধারণ মানুষ
বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্য না
পেলে সংস্থার উদ্দেশ্য সফল হবে না। ২০০৮ সালে ৫ সদস্যের নতুন
কমিটি গঠিত হয় জেলায়। এই কমিটির চেয়ারপারসন নিযুক্ত
হন, মানসিক সমস্যা-যুক্ত শিশুদের সংস্থা ‘সাহস’-এর
সঙ্গে যুক্ত দুর্গাপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মধুমিতা জাজোরিয়া। কমিটির অন্যান্য
সদস্যেরা হলেন সমাজসেবী ও আইসিডিএস কর্মী বনানী রায়, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত মঞ্জুষা চৌধুরী, স্কুল শিক্ষিকা কৃষ্ণকলি বন্দ্যোপাধ্যায় ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অশোক পাত্র।
মধুমিতাদেবী
জানালেন, শিশুদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে প্রথম দিন থেকেই কাজ
করে চলেছে তাঁদের কমিটি। শিশুকে কুড়িয়ে পাওয়ার পর কেউ সরাসরি
তাকে দত্তক নিতে পারেন না। এই কমিটি সেখানে মাধ্যম হিসাবে কাজ করে। প্রথমে কুড়িয়ে পাওয়া শিশুটিকে রাখা হয় হাসপাতালে। দু’মাস
অপেক্ষা করে দেখা হয় শিশুটির অভিভাবক হিসাবে
কোনও দাবিদার আছেন কি না। এই সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেই সেই শিশুকে কেউ দত্তক নিতে
পারেন। দত্তক নিতে ইচ্ছুক পরিবারের আর্থিক অবস্থা কেমন, পরিবেশ
উপযুক্ত কি না সে সবই খতিয়ে দেখা হয়। তবে সেই
পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে কোনও শিশুকে। দত্তক দেন
জেলা বিচারক।
কমিটি গঠনের বছর
খানেকের মধ্যে ১১টি শিশুকে দত্তক হিসাবে বিভিন্ন পরিবারের হাতে
তুলে দেওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিটির চেয়ারপারসন মধুমিতাদেবী।
তিনি আরও জানালেন, আগামী বছরের জানুয়ারি মাস নাগাদ
আরও ৫ শিশুকে দত্তক হিসাবে তুলে দেওয়া হবে কয়েকটি পরিবারের হাতে।
সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে কমিটি। পরিত্যক্ত নবজাতকের খবর মাঝে মধ্যেই খবরের শিরোনামে
আসে। দেখা গিয়েছে, তার মধ্যে শিশুকন্যার সংখ্যাই বেশি।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন মধুমিতাদেবী।
তিনি জানিয়েছেন, দত্তক নিতে চেয়ে যাঁরা আবেদন
করেন, তাঁদের মধ্যে শিশুকন্যার চাহিদাও নাকি বেশি।
|